প্রিন্ট এর তারিখ : ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬
তাহিরপুরে বাঁধের কাজের অর্থ আত্মসাতকারী এনায়েত পাটোয়ারী
||
স্টাফ রিপোর্টার
হাওরের বোরো ফসলরক্ষা ডুবন্ত বাঁধ নির্মাণ কাজের প্রকল্পের স্টেশনারি মালামাল ক্রয় ও আপ্যায়ন খরচসহ আনুষাঙ্গিক বিল বাবদ ১ পারসেন্ট (ভাগ) টাকার একটি চেকের আড়াই লাখের বেশি টাকা বাহক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অগোচরেই উত্তোলন ও আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় এই ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই ঘটনায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বোরো ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) প্রকল্প বাস্তবায়ন ও মনিটরিং এর উপজেলা কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগটি করেছেন উপজেলা কাবিটা বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত শাখা কর্মকর্তা (এসও) উপ-সহকারী প্রকৌশলী মনির হোসেন। গত ৭ অক্টোবর লিখিত এই অভিযোগ করেন তিনি। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর উপজেলা প্রশাসনে তোলপাড় চলছে।
লিখিত অভিযোগে উপ-সহকারী প্রকৌশলী মনির হোসেন উল্লেখ করেছেন, ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে সংশোধিত ‘কাবিটা নীতিমালা ২০২৩’-এর আওতায় তাহিরপুর উপজেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) ক্ষতিগ্রস্ত ডুবন্ত বাঁধ মেরামত কাজের ব্যয় করা অর্থের ১ পারসেন্ট আনুষাঙ্গিক বিল বাবদ গত ২৮ জুন স্টেশনারি মালামাল ক্রয় ও আপ্যায়ন খরচ বাবদ ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৮৯ টাকার একটি চেক (চেক নং: ০৯৩০০৯৮) প্রস্তুত করা হয়েছিল।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, উপজেলা কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে চেকটিতে স্বাক্ষরের পর তিনি (উপ-সহকারী প্রকৌশলী মনির হোসেন) উপজেলা কমিটির সভাপতি ইউএনও’র স্বাক্ষরের জন্য প্রেরণ করেছিলেন। ইউএনও’র স্বাক্ষরের পর চেকটি অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরি বিশ্বজিৎ সূত্রধরের নিকট পানি উন্নয়ন শাখার দাপ্তরিক কাজে জমা দেওয়ার জন্য রাখা হয়। পরবর্তীতে ওই চেকের বিষয়ে বিশ্বজিৎ সূত্রধরের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি চেকটি অফিসে জমা দেননি।এরপর গেল ৬ অক্টোবর কাবিটা চলতি হিসাব (হিসাব নং: ৫৯১১৩০২০০০৬৪০)-এর সোনালী ব্যাংকের তাহিরপুর শাখা থেকে হিসাব বিবরনী উত্তোলনের পর জানতে পারেন ০৯৩০০৯৮ নং চেকের মাধ্যমে গেল সেপ্টেম্বর ২০ তারিখ ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। ফলে কাবিটা প্রকল্পের ব্যাংক চলতি হিসাবের হিসাব বিবরণীর সঙ্গে বিল রেজিস্টারের বৈষম্য দেখা দিয়েছে। সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও অনিয়মের বিষয়ে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান তিনি।
এদিকে স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই চেকটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের তাহিরপুর উপজেলা অফিসের কার্যসহকারী জিলানী মিয়ার পাউবোর কার্যসহকারী জিলানী মিয়ার নামে থাকলেও তিনি চেকটির টাকা উত্তোলন করেননি। ইএনও’র অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরি বিশ্বজিৎ সূত্রধরের বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হলেও ব্যাংক থেকে টাকাগুলো উত্তোলন করেছেন ইউএনও’র কার্যালয়ের আউটসোর্সিং-এর কর্মচারী এনায়েত পাটোয়ারী। ব্যাংক থেকে চেক দিয়ে কোন টাকা তোলেননি বলে নিশ্চিত করেছেন, পাউবোর কার্যসহকারী জিলানী মিয়া।
সোনালী ব্যাংক পিএলসির তাহিরপুর শাখার ব্যবস্থাপক অর্পন যেত্রা বলেন, বেয়ারার চেকের টাকা যে কোন ব্যাংকে নিয়ে আসলে উত্তোলন করতে পারেন। এছাড়া পরিচিতজনরা আসলে আমরা বেয়ারার চেকের টাকা দিয়ে দেই। ইউএনও অফিসের স্টাফ এনায়েত পাটোয়ারী এই চেকের টাকা উত্তোলন করে নিয়েছেন। তিনি ইউএনও অফিসের স্টাফ, এই পরিচয়েই আমরা টাকা দিয়েছি।
টাকা উত্তোলনের অভিযোগের বিষয়ে ইউএনও’র কার্যালয়ের আউটসোর্সিং এর কর্মচারী এনায়েত পাটোয়ারীর সঙ্গে কথা বলতে চাইলে বেশ কয়েক বার ফোন করলেও তিনি মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি। মোবাইল ফোন ও ওয়াট্সআপ ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক বিশ্বজিৎ সূত্রধর অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্পের কাজের চেকের বিষয়ে উপ-সহকারী প্রকৌশলী ভালো জানেন। অন্যের নামের চেকের টাকা আমার তোলার সুযোগ নেই। অভিযোগ হয়েছে এখন ইউএনও স্যার তদন্ত করবেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তাহিরপুরের দায়িত্বপ্রাপ্ত শাখা কর্মকর্তা (এসও) উপ-সহকারী প্রকৌশলী মনির হোসেন আজ মঙ্গলবার বিকেল বলেছেন, সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজার জানিয়েছেন এই চেকের টাকা ইউএনও’র অফিসের কর্মচারী এনায়েত পাটোয়ারী উত্তোলন করেছেন। ইউএনও স্যারের সঙ্গে কথা হয়েছে আগামীকাল বুধবার আমি তাহিরপুরে যাব।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিপামনি দেবী বলেন, টাকা উত্তোলনের ঘটনা আমি যোগদানের আগের। ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের বিষয়ে আমার কিছুই জানা নেই। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মনির হোসেন একটি অভিযোগ দিয়েছেন। এই চেকটি তার কাছে থাকার কথা। এটি কীভাবে অন্যজন উত্তোলন করলেন? উনি নিয়ম মোতাবেক কাজ করেননি। ব্যাংক ম্যানেজারও এভাবে অন্যকে টাকা দিয়ে সঠিক করেননি। যেহেতু লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন, বিষয়টির তদন্ত চলছে। তদন্ত করে দ্রুত প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য উপজেলা সমবায় অফিসারকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তাহিরপুরের সাবেক (বর্তমানে চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জের উপজেলা) নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান মানিক বলেন, বোরো ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের কাজের চেক পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মনির হোসেনের কাছেই থাকে, তিনি বলতে পারবে চেকের টাকা কে উত্তোলন করেছে। যেহেতু বদলি হয়ে এসেছি তাই এখন বিস্তারিত বলতে পারব না। এই বিষয়ে লিখিত অভিযোগ হয়ে থাকলে বর্তমান ইউএনও বিষয়টির তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. হাবিবুর রহমান।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত রক্তি নিউজ