রক্তি নিউজ

সারাদেশ

ছাতকের বিল-নদীতে নিষিদ্ধ জালের ফাঁদ, হুমকিতে দেশি প্রজাতির মাছ

প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
ছাতকের বিল-নদীতে নিষিদ্ধ জালের ফাঁদ, হুমকিতে দেশি প্রজাতির মাছ

অজিত কুমার দাশ,ছাতক 

একসময় বর্ষা এলেই ছাতকের বিল-নদী ও জলাশয়গুলোতে দেখা মিলত দেশি নানা প্রজাতির মাছের। পানির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ত মাছের আনাগোনা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। এখন অনেক জলাশয়েই মাছের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজননের জায়গা দখল করে নিয়েছে নিষিদ্ধ ও অবৈধ জাল।

সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার বিভিন্ন বিল, নদী, খাল ও জলাশয়ে কারেন্ট জাল, চায়না রিং জাল, ম্যাজিক জাল, সুতিজাল, চায়না দোয়ারী ও রিংচাইসহ বিভিন্ন ধরনের নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করে অবাধে মাছ শিকারের অভিযোগ উঠেছে।

বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এসব জালের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বড় মাছের পাশাপাশি নির্বিচারে ধরা পড়ছে মাছের পোনা, ডিমওয়ালা মাছ ও ছোট আকারের দেশি প্রজাতির মাছ। এতে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ব্যাহত হয়ে জলাশয়ের জীববৈচিত্র্য ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

উপজেলার কুড়ি বিল, সিংগাপই বিল, নলুয়া বিল, মৌআলু বিল, দেউসাফরা বিল, বোকা নদী ও রাংড়িংগা নদীসহ বিভিন্ন জলাশয়ে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, এসব জালের সূক্ষ্ম ফাঁকে বড় মাছের পাশাপাশি পোনা, ছোট মাছ এবং বিভিন্ন জলজ প্রাণীও আটকা পড়ে। ফলে মাছের সঙ্গে সঙ্গে সাপ, ব্যাঙ, শামুকসহ জলজ পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রাণীও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

দেবেরগাঁও গ্রামের মৎস্যজীবী নরেশ চন্দ্র বলেন, “কুড়ি বিলের আশপাশে এবং বিলের ভেতরে অবৈধ চায়না দোয়ারী ও রিং জাল ব্যবহার করে মাছ শিকার করা হচ্ছে। বিষয়টি মৎস্য অফিসকে জানানো হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় ছাতকের বিল ও নদীতে প্রচুর পরিমাণে শোল, বোয়াল, গজার, মাগুর, শিং, কৈ, সরপুঁটি, পাবদা, আইড়, বাইম, খলসে, রিঠা, বেতাগা, বাঁশপাতা, রয়না ও কালিবাউশসহ নানা প্রজাতির দেশি মাছ পাওয়া যেত।

বর্তমানে এসব মাছের অনেক প্রজাতিই আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। স্থানীয় হাট-বাজারেও দেশি মাছের সরবরাহ ও বৈচিত্র্য কমছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, মাছের প্রজনন ও ডিম ছাড়ার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নিষিদ্ধ জাল দিয়ে পোনা ও ছোট মাছ ধরে ফেলার কারণেই জলাশয়ে মাছের স্বাভাবিক বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধে শুধু মাঝে মধ্যে অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না। অবৈধ জাল উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যবহার-তিন ক্ষেত্রেই কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

লিখিত ও মৌখিকভাবে সংশ্লিষ্টদের বিষয়টি জানানো হলেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

তবে মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলা হয়েছে, তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে ছাতক উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. হানিফ উদ্দিন বলেন, “কোন কোন জায়গায় অবৈধ জাল দিয়ে মাছ মারা হচ্ছে, আমাদের তথ্য দিলে আমরা অভিযান পরিচালনা করব। সবার সহযোগিতা পেলে অভিযান অব্যাহত রাখব এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর এখনই ব্যবস্থা না নিলে বিপন্ন হবে দেশি মাছ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশি মাছের প্রজনন ও জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রজনন মৌসুমে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করা জরুরি। পাশাপাশি নিয়মিত অভিযান, জলাশয়ে মাছের অভয়াশ্রম গড়ে তোলা এবং জেলে ও মাছ শিকারিদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

স্থানীয় সচেতন মহলের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে একসময় ছাতকের বিল-নদী ও জলাশয় থেকে হারিয়ে যেতে পারে বহু পরিচিত দেশি মাছের প্রজাতি। তখন শুধু মাছের সংকট নয়, বদলে যেতে পারে ছাতকের দীর্ঘদিনের জলজ জীববৈচিত্র্যের চিত্রও।

আপনার মতামত লিখুন

রক্তি নিউজ

শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


ছাতকের বিল-নদীতে নিষিদ্ধ জালের ফাঁদ, হুমকিতে দেশি প্রজাতির মাছ

প্রকাশের তারিখ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

অজিত কুমার দাশ,ছাতক 

একসময় বর্ষা এলেই ছাতকের বিল-নদী ও জলাশয়গুলোতে দেখা মিলত দেশি নানা প্রজাতির মাছের। পানির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ত মাছের আনাগোনা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। এখন অনেক জলাশয়েই মাছের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজননের জায়গা দখল করে নিয়েছে নিষিদ্ধ ও অবৈধ জাল।

সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার বিভিন্ন বিল, নদী, খাল ও জলাশয়ে কারেন্ট জাল, চায়না রিং জাল, ম্যাজিক জাল, সুতিজাল, চায়না দোয়ারী ও রিংচাইসহ বিভিন্ন ধরনের নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করে অবাধে মাছ শিকারের অভিযোগ উঠেছে।

বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এসব জালের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বড় মাছের পাশাপাশি নির্বিচারে ধরা পড়ছে মাছের পোনা, ডিমওয়ালা মাছ ও ছোট আকারের দেশি প্রজাতির মাছ। এতে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ব্যাহত হয়ে জলাশয়ের জীববৈচিত্র্য ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

উপজেলার কুড়ি বিল, সিংগাপই বিল, নলুয়া বিল, মৌআলু বিল, দেউসাফরা বিল, বোকা নদী ও রাংড়িংগা নদীসহ বিভিন্ন জলাশয়ে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, এসব জালের সূক্ষ্ম ফাঁকে বড় মাছের পাশাপাশি পোনা, ছোট মাছ এবং বিভিন্ন জলজ প্রাণীও আটকা পড়ে। ফলে মাছের সঙ্গে সঙ্গে সাপ, ব্যাঙ, শামুকসহ জলজ পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রাণীও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

দেবেরগাঁও গ্রামের মৎস্যজীবী নরেশ চন্দ্র বলেন, “কুড়ি বিলের আশপাশে এবং বিলের ভেতরে অবৈধ চায়না দোয়ারী ও রিং জাল ব্যবহার করে মাছ শিকার করা হচ্ছে। বিষয়টি মৎস্য অফিসকে জানানো হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় ছাতকের বিল ও নদীতে প্রচুর পরিমাণে শোল, বোয়াল, গজার, মাগুর, শিং, কৈ, সরপুঁটি, পাবদা, আইড়, বাইম, খলসে, রিঠা, বেতাগা, বাঁশপাতা, রয়না ও কালিবাউশসহ নানা প্রজাতির দেশি মাছ পাওয়া যেত।

বর্তমানে এসব মাছের অনেক প্রজাতিই আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। স্থানীয় হাট-বাজারেও দেশি মাছের সরবরাহ ও বৈচিত্র্য কমছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, মাছের প্রজনন ও ডিম ছাড়ার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নিষিদ্ধ জাল দিয়ে পোনা ও ছোট মাছ ধরে ফেলার কারণেই জলাশয়ে মাছের স্বাভাবিক বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধে শুধু মাঝে মধ্যে অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না। অবৈধ জাল উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যবহার-তিন ক্ষেত্রেই কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

লিখিত ও মৌখিকভাবে সংশ্লিষ্টদের বিষয়টি জানানো হলেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

তবে মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলা হয়েছে, তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে ছাতক উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. হানিফ উদ্দিন বলেন, “কোন কোন জায়গায় অবৈধ জাল দিয়ে মাছ মারা হচ্ছে, আমাদের তথ্য দিলে আমরা অভিযান পরিচালনা করব। সবার সহযোগিতা পেলে অভিযান অব্যাহত রাখব এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর এখনই ব্যবস্থা না নিলে বিপন্ন হবে দেশি মাছ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশি মাছের প্রজনন ও জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রজনন মৌসুমে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করা জরুরি। পাশাপাশি নিয়মিত অভিযান, জলাশয়ে মাছের অভয়াশ্রম গড়ে তোলা এবং জেলে ও মাছ শিকারিদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

স্থানীয় সচেতন মহলের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে একসময় ছাতকের বিল-নদী ও জলাশয় থেকে হারিয়ে যেতে পারে বহু পরিচিত দেশি মাছের প্রজাতি। তখন শুধু মাছের সংকট নয়, বদলে যেতে পারে ছাতকের দীর্ঘদিনের জলজ জীববৈচিত্র্যের চিত্রও।


রক্তি নিউজ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. হাবিবুর রহমান।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত রক্তি নিউজ